সবার চেয়ে আপনারই বেশি গরম লাগে? জানলে অবাক হবেন এর আসল কারণ



লাইফস্টাইল ডেস্ক: 

 প্রচণ্ড গরমে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেও স্বাভাবিক থাকেন, আবার কেউ অল্প সময় রোদে থাকলেই হাঁপিয়ে ওঠেন, অতিরিক্ত ঘামেন বা মাথা ঘোরার মতো সমস্যায় পড়েন। একই পরিবেশে থেকেও মানুষের গরম সহ্য করার ক্ষমতা কেন ভিন্ন—এর উত্তর লুকিয়ে আছে শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায়।

চিকিৎসকদের মতে, শরীরের নিজস্ব একটি থার্মোরেগুলেশন (তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ) ব্যবস্থা রয়েছে। মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাস শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে ঘাম, রক্তনালীর প্রসারণ এবং রক্তসঞ্চালনের মাধ্যমে শরীরকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু রোগ, হরমোনের পরিবর্তন কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধের কারণে এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি গরম অনুভূত হতে পারে।

১. থাইরয়েডের অতিসক্রিয়তা

হাইপারথাইরয়েডিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীরে থাইরয়েড হরমোন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে। এতে বিপাকক্রিয়া দ্রুত হয়ে শরীর অতিরিক্ত তাপ উৎপন্ন করে।

লক্ষণ

  • সবসময় গরম লাগা

  • অতিরিক্ত ঘাম

  • হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া

  • ওজন কমে যাওয়া

  • অস্থিরতা ও ঘুমের সমস্যা


২. ডায়াবেটিস

অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস দীর্ঘদিন থাকলে স্নায়ুর ক্ষতি (ডায়াবেটিক নিউরোপ্যাথি) হতে পারে। এতে ঘামগ্রন্থির কার্যকারিতা কমে যায় এবং শরীর প্রয়োজনমতো ঠান্ডা হতে পারে না।

এর ফলে

  • গরম বেশি লাগে

  • দ্রুত ক্লান্তি আসে

  • পানিশূন্যতার ঝুঁকি বাড়ে

  • হিট এক্সহস্টশনের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়


৩. হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপ

শরীর ঠান্ডা রাখতে রক্তনালীর মাধ্যমে তাপ বাইরে বের হয়। কিন্তু হৃদরোগ বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে এই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

বিশেষ করে কিছু ব্লাড প্রেসারের ওষুধ শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণেও প্রভাব ফেলতে পারে।


৪. স্থূলতা

শরীরে অতিরিক্ত চর্বি তাপ ধরে রাখে। ফলে শরীরের ভেতরে উৎপন্ন তাপ সহজে বের হতে পারে না।

স্থূল ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে—

  • দ্রুত ঘাম হয়

  • হাঁপিয়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে

  • শরীর ঠান্ডা হতে বেশি সময় লাগে

  • হিট স্ট্রোকের ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি


৫. রক্তস্বল্পতা (অ্যানিমিয়া)

রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। ফলে গরমের সময় শরীর দ্রুত শক্তি হারিয়ে ফেলে।

সাধারণ উপসর্গ

  • মাথা ঘোরা

  • দুর্বলতা

  • অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্তি

  • বুক ধড়ফড় করা


৬. মেনোপজ, গর্ভাবস্থা ও হরমোনের পরিবর্তন

নারীদের মেনোপজের সময় ইস্ট্রোজেন কমে যাওয়ায় হট ফ্ল্যাশ দেখা দেয়। এতে হঠাৎ শরীর গরম হয়ে যায়, মুখ লাল হয়ে যায় এবং প্রচুর ঘাম হয়।

এছাড়া—

  • গর্ভাবস্থা

  • মাসিক চক্রের নির্দিষ্ট সময়

  • হরমোনজনিত অন্যান্য পরিবর্তনেও

শরীর তাপমাত্রার প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।


৭. পানিশূন্যতা

শরীরের প্রাকৃতিক কুলিং সিস্টেম হলো ঘাম। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি না থাকলে ঘাম কম হয় এবং শরীর ঠান্ডা হতে পারে না।

যা হতে পারে

  • মাথা ঘোরা

  • মুখ শুকিয়ে যাওয়া

  • প্রস্রাব কমে যাওয়া

  • হিট এক্সহস্টশন

  • হিট স্ট্রোক


৮. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

কিছু ওষুধ শরীরের পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে অথবা ঘাম কমিয়ে দিতে পারে।

যেমন—

  • ডাইইউরেটিক (মূত্রবর্ধক) ওষুধ

  • উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ

  • মানসিক রোগের কিছু ওষুধ

  • অ্যান্টিহিস্টামিনের কিছু ধরন

  • কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট


আর কারা বেশি ঝুঁকিতে?

গরমে নিচের ব্যক্তিদের বিশেষ সতর্ক থাকা উচিত—

  • ৬৫ বছরের বেশি বয়স্ক ব্যক্তি

  • শিশু

  • গর্ভবতী নারী

  • কিডনি রোগী

  • লিভারের রোগী

  • দীর্ঘদিন বাইরে কাজ করেন এমন শ্রমিক

  • খেলোয়াড় ও ভারী ব্যায়াম করা ব্যক্তি


গরমে সুস্থ থাকতে যা করবেন

  • প্রতিদিন পর্যাপ্ত পানি পান করুন।

  • অতিরিক্ত ঘাম হলে ওআরএস বা ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় গ্রহণ করুন।

  • সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে অপ্রয়োজনে বাইরে যাওয়া এড়িয়ে চলুন।

  • হালকা রঙের সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন।

  • ক্যাফেইন ও অতিরিক্ত অ্যালকোহলজাতীয় পানীয় কম পান করুন।

  • বাইরে থাকলে ছাতা, টুপি বা সানগ্লাস ব্যবহার করুন।

  • এসি না থাকলেও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে থাকুন।

  • দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করলে প্রতি ২০–৩০ মিনিট পরপর বিশ্রাম নিন।


কখন দ্রুত হাসপাতালে যাবেন?

নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন—

  • শরীরের তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হওয়া

  • অজ্ঞান হয়ে যাওয়া

  • বিভ্রান্তি বা অসংলগ্ন কথা বলা

  • শ্বাসকষ্ট

  • বমি থামছে না

  • অতিরিক্ত দুর্বলতা

  • হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত হওয়া

  • ঘাম বন্ধ হয়ে গিয়েও শরীর অত্যন্ত গরম থাকা

এসবই হিট স্ট্রোক-এর লক্ষণ হতে পারে, যা জরুরি চিকিৎসা ছাড়া প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

বিশেষজ্ঞদের মতে, গরম বেশি লাগলেই সেটিকে শুধু আবহাওয়ার প্রভাব বলে উড়িয়ে দেওয়া উচিত নয়। দীর্ঘদিন ধরে অস্বাভাবিক গরম লাগা, অতিরিক্ত ঘাম, দ্রুত ক্লান্তি বা হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি। কারণ এসব উপসর্গ অনেক সময় থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা অন্য কোনো অন্তর্নিহিত শারীরিক জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।

সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO), Mayo Clinic, Harvard Health Publishing, Cleveland Clinic।

Previous Post Next Post