তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া :
একটি স্বৈরাচারী শাসনের ভিত্তি কতটা ভয়াল ও নির্মম হতে পারে, তা গত ১৭ বছরের রক্তঝরা ইতিহাসই বহন করে। চারদিকে যখন গুম, খুন, হত্যা, হামলা ও সাজানো মামলার একচ্ছত্র রাজত্ব চলছিল, যখন বিরোধী রাজনীতির জন্য কথা বলাও মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার নামান্তর ছিল—ঠিক সেই ঘোর অমানিশার মধ্যে ক্ষমতার লোভ ভুলে রাজপথে নেমেছিল জনতার অধিকার পার্টিসহ (পিআরপি) বিরোধী ও ছোট ছোট রাজনৈতিক দলগুলো। জীবনের মায়া ত্যাগ করে, শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু বাজি রেখে পুলিশের লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও বুলেটের মুখে রাজপথ আগলে রেখেছিল এই লড়াকু নেতাকর্মীরা। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, রাজপথের সেই রক্তক্ষয়ী লড়াই ও ত্যাগের সফলতায় ক্ষমতার পরিবর্তন এবং সাত মাস অতিবাহিত হয়ে গেলেও—মূল্যায়নের পাতায় সেই দুঃসময়ের সংগ্রামীদের নাম যেন আজ এক ফোঁটা কালির নিচেই হারিয়ে গেছে।
আজ যখন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দরজায় দেশের কোনো সমস্যা বা দাবি নিয়ে যাওয়া হয়, তখন এক নির্মম ও আপত্তিকর অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে হয়। যেসব রাজপথের সংগ্রামীদের বুকের ওপর দাঁড়িয়ে আজকের মন্ত্রী-এমপিরা ক্ষমতার মসনদে বসেছেন, তাদের দপ্তরগুলো আজ দখল করে বসে আছে একশ্রেণির ‘পিএস’ এবং ‘এপিএস’ নামধারী সুযোগসন্ধানী ও আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট। তারা এমন এক ঔদ্ধত্য দেখাচ্ছেন, যেন মন্ত্রী নয়—স্বয়ং এপিএসরাই ওই চেয়ার ও মন্ত্রণালয়ের আসল মালিক!
বিগত ১৭ বছর রাজপথে যখন রাজপথের কর্মীরা পুলিশি নির্যাতন সহ্য করে ৩০ জন, ৫০ জন বা ১০০ জন মানুষ নিয়ে মিছিল পরিচালনা করেছিল, তখন এই সুযোগসন্ধানীরা কোথায় ছিল? অথচ আজ জাতীয়তাবাদী শক্তির ছায়াতলে এসে তারা এমন আচরণ করছে, যেন অতীতের কোনো সংগ্রাম বা আন্দোলনের ইতিহাসই তাদের জানা নেই। একজন রাজপথের লড়াকু নেতাকে তাদের কাছে গিয়ে অনুনয়-বিনয় করতে হয় এবং প্রতিদানে পেতে হয় চরম তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও অপমানজনক ব্যবহার।
স্বাস্থ্য কিংবা গণপূর্তের মতো স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়গুলোর অবস্থা আজ আরও নাজুক। অভিজ্ঞ ও জ্যেষ্ঠ ক্যাডার সচিবরাও এই এপিএসদের ধমক ও দাপটে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। মন্ত্রণালয়ের সচিবরা গোপনে আফসোস করে বলছেন—এত পড়াশোনা করে সচিব হয়েছি কেবল অনভিজ্ঞ ও ক্ষমতার গরমে অন্ধ হয়ে থাকা এসব এপিএসের অহেতুক নির্দেশ পালনের জন্য নয়!
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে তাকালে মনে হয়, প্রতিমন্ত্রী যেন আজ নামমাত্র পুতুল; পেছনে সুতা কাটছে এপিএস সিন্ডিকেট। মামুনের নেতৃত্বে বিভিন্ন হাসপাতালের টেন্ডার, বড় বড় পদায়ন এবং আরও অনেক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে। অথচ আমাদের মতো রাজপথের নেতারা যখন তার দরজায় যান, তখন তিনি মানুষকে মানুষ মনে করেন না—এমন অভিযোগও রয়েছে। মনে হয়, তিনি যেন মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মালিকানার দায়িত্বই নিয়েছেন। স্বাস্থ্য খাতে দুর্ভাগ্যের অন্যতম কারিগর হিসেবে অনেকে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রীর বন্ধু এপিএস মামুনকে দায়ী করেন। তিনি ঘিরে একটি বড় সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে ক্যাডার বাহিনী, ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ টাকার বাহিনীসহ আরও অনেকের সম্পৃক্ততার কথা শোনা যায়। বুঝলে হয়তো বাংলাদেশের ভাষায় ‘বুঝপাতা’, না বুঝলে নোয়াখালীর ভাষায় ‘সবই তেজপাতা’!
একটি সরকার যদি এমন এপিএস-নির্ভর হয়ে পড়ে, তবে আমলাতন্ত্রের বিশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক স্থবিরতা এড়ানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আন্দোলন-সংগ্রামের সেই দুঃসহ দিনগুলোর কথা এত সহজে ভোলা যায় না। ২০২৩ সালের ১২ নভেম্বর রাজপথে মিছিলে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় ডিবি পরিচয়ে আমায় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেদিন গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকা এবং সাধারণ মানুষের প্রার্থনায় হয়তো গুম হয়ে যাওয়া থেকে বেঁচে ফিরেছিলাম। পরবর্তীতে রিমান্ডে এনে ডিবি কার্যালয়ে ৩ কোটি টাকার লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল—কেবল বিএনপির বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা বক্তব্য দেওয়ার জন্য। কিন্তু নীতি ও আদর্শের সঙ্গে আপস করিনি; লোভের কাছে মাথা নত করিনি।
কেরানীগঞ্জ ও অন্যান্য কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটানো সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে। পল্টন থানায় রিমান্ডের একটি চিত্রও রয়েছে আমার কাছে, যেখানে আমার সঙ্গে কারাবন্দি ছিলেন কেরানীগঞ্জ থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক রাহমাতুল্লাহ নবী এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক রনি। রিমান্ডে বাথরুমের ময়লা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির মধ্যে কম্বল বিছিয়ে ঘুমানোর অমানুষিক নির্যাতনের ক্ষত আজও সারা শরীরে গেঁথে আছে।
অথচ আজ যখন ক্ষমতাসীনেরা বলেন—“তোমাদের দলের তো নিবন্ধন নেই, কর্মী কয়টা?”—তখন হৃদয়ে চরম রক্তক্ষরণ হয়। দুঃসময়ে যখন ৫ জন বা ১০ জনের মিছিলের ছবিও মিডিয়া সেল ও প্রেস রিলিজের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল, তখন তো এই নিবন্ধনের প্রশ্ন তোলা হয়নি! আজ ৫ আগস্টের পর বিদেশ থেকে ফেরা কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকা ব্যক্তিরা রাতারাতি মন্ত্রী-এমপি হয়ে রাজপথের ছোট ছোট দলগুলোকে খাটো করছেন।
কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত, একটি কোটি টাকার দামি গাড়ির কাঁচ গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য আস্ত কোনো পাহাড়ের প্রয়োজন হয় না—একটি ছোট ইটের টুকরাই যথেষ্ট। শেখ হাসিনার ১৭ বছরের অহংকারের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে রাজপথের এই ছোট ছোট দলগুলোই ছিল সেই অপ্রতিরোধ্য ‘ইটের টুকরা’।
জাতীয়তাবাদী দর্শন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার গণতান্ত্রিক আদর্শকে বুকের ভেতর ধারণ করে আমরা রাজনীতি করেছি। শত নির্যাতন ও প্রলোভনেও কখনো এই দর্শনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করিনি, গাদ্দারি করিনি।
## রাজনীতির রাজপথ ও ত্যাগের সমীকরণ: তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার সংগ্রাম এবং জনতার অধিকার পার্টি
রাজনীতির ইতিহাস সবসময় ক্ষমতার আলোর নিচে থাকা মানুষগুলোকে মনে রাখে না; ইতিহাস তৈরি হয় সেইসব নীরব সংগ্রামীদের ঘামে, রক্তে এবং ত্যাগে—যাঁরা রাজপথকে নিজের ঘর বানিয়ে নেন। তৎকালীন কঠিন দিনগুলোতে মামলা, হামলা, রিমান্ড আর জেল-জুলুমের মুখোমুখি হয়েও যাঁরা পিছু হঠেননি, মো. তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া তেমনই একজন লড়াকু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। কিন্তু রাজনীতির এই দীর্ঘ ট্র্যাজেডি হলো, দুঃসময়ের রাজপথের সৈনিকেরা সুসময়ে প্রায়শই হারিয়ে যান স্মৃতির আড়ালে।
একটি বহুল আলোচিত সত্য আজ উঠে এসেছে তাঁরই জীবনসংগ্রামের অভিজ্ঞতা থেকে। ২০২২ সালের ডিসেম্বরে পল্টন থানার রিমান্ডে অমানুষিক নির্যাতন কিংবা ২০২৩ সালের নভেম্বরে প্রেসক্লাবের সামনে অবরোধের মিছিলে গ্রেপ্তার—সবকিছুই ছিল অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের একেকটি ক্ষতচিহ্ন। কনডেম সেলের একাকী রাত, সিঁড়ির রুমে ঘুমিয়ে থাকা, আর পরিবারের অঝোর কান্নাকে সঙ্গী করে যিনি আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন, ক্ষমতার রাজনীতিতে আজ তাঁর মতো বহু কর্মীর স্থান যেন বহুদূরের সারিতে।
মালিবাগের ‘তারেক ফিজিওথেরাপি সেন্টার’-এর ৬০ লাখ টাকার বিনিয়োগ ৩ লাখ টাকায় বিক্রি করে নিঃস্ব হওয়ার গল্পটি শুধু এক তারিকুল ইসলামের নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শ ধরে রাখতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হওয়া অগণিত ত্যাগী কর্মীর প্রতিনিধিত্বকারী দলিল।
এই সামাজিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার প্রেক্ষাপটেই জন্ম নিয়েছে ‘জনতার অধিকার পার্টি’। এই প্ল্যাটফর্ম কেবল কোনো দলীয় পরিচয় নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষ ও উপেক্ষিত রাজনৈতিক কর্মীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অঙ্গীকার। যখন সুবিধাবাদী আর বসন্তের কোকিলেরা ক্ষমতার চারপাশে ভিড় জমাচ্ছে, তখন ‘জনতার অধিকার পার্টি’ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হওয়া উচিত জনকল্যাণ এবং ত্যাগী কর্মীদের সম্মান সহযোগিতার জন্য গিয়ে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দরজায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হন, তখন তৈরি হয় এক গভীর সামাজিক ক্ষোভ। নীতি ও আদর্শের রাজনীতি যদি ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়।
আজ যখন একজন কর্মী কোনো সুপারিশ বা সহযোগিতার জন্য গিয়ে প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক দরজায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের শিকার হন, তখন তৈরি হয় এক গভীর সামাজিক ক্ষোভ। নীতি ও আদর্শের রাজনীতি যদি ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন না করে, তবে তা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামোর জন্য এক আশঙ্কাজনক বার্তা বয়ে আনে।
তারিকুল ইসলাম ভূঁইয়া এবং ‘জনতার অধিকার পার্টি’ আজ সেই বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক সচেতন উচ্চারণ। কথা দিয়ে নয়, কাজের মাধ্যমে জনগণের অধিকার ফিরিয়ে আনার যে প্রত্যয় তাঁরা ব্যক্ত করেছেন—তা আমাদের রাজনীতিতে নীতি ও ত্যাগের পুনঃপ্রতিষ্ঠার এক জরুরি তাগিদ। কারণ, যে রাজনীতি দুঃসময়ের কাণ্ডারিদের ভুলে যায়, সে রাজনীতি শেষ পর্যন্ত জনগণের বিশ্বাস ধরে রাখতে পারে না।
তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের প্রতি দেশবাসীর পক্ষ থেকে আকুল আহ্বান—আপনার চারপাশের এই সুবিধাবাদী পিএস সিন্ডিকেট ও অযোগ্যদের প্রতি অবিলম্বে কঠোর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ান। আজ যদি রাজপথের রাজসাক্ষী ও দুঃসময়ের সঙ্গীদের দূরে ঠেলে দিয়ে তোষামোদকারীদের তোষণ করা হয়, তবে সাধারণ মানুষ ও নির্যাতিত মজলুমদের রোদ-বৃষ্টির দীর্ঘশ্বাস রাষ্ট্রকে এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাবে।
আমরা কোনো ব্যক্তিস্বার্থ বা ক্ষমতার দাপট চাই না; আমাদের একমাত্র চাওয়া—সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর, বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা। জনতার অধিকার পার্টি শত নিপীড়নেও নীতি হারায়নি, রাজপথ ছেড়ে যায়নি এবং ভবিষ্যতেও যাবে না। অনাগত দিনে ইতিহাসের পাতায় সত্যের জয় হবেই এবং রাজপথের প্রতিটি রক্তবিন্দুর মর্যাদা একদিন নিশ্চিত হবে।
লেখক: তরুণ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও চেয়ারম্যান, জনতার অধিকার পার্টি (পিআরপি)।

