কেন ধৈর্য একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি? এর পুরস্কারই বা কেন সীমাহীন?

 

 

বর্তমান যুগে মানুষ সবচেয়ে বেশি যে সংকটে ভুগছে, তা হলো অস্থিরতা। সামান্য ব্যর্থতা, দুঃসংবাদ, আর্থিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন কিংবা জীবনের অনিশ্চয়তা মানুষকে দ্রুত হতাশ করে তোলে। অথচ একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলোধৈর্য। কারণ ধৈর্য শুধু কষ্ট সহ্য করার নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাস, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও সৎ পথে অবিচল থাকার এক মহান গুণ।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের জন্য এমন এক সুসংবাদ দিয়েছেন, যা সত্যিই অভাবনীয়। তিনি বলেন

قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ ۚ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَٰذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ ۗ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ ۗ إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ

বলুন, হে আমার মুমিন বান্দারা, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা দুনিয়ায় সৎকর্ম করে, তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর জমিন প্রশস্ত। নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেওয়া হবেকোনো হিসাব ছাড়াই।’ (সুরা আয-যুমার: আয়াত ১০)

এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ধৈর্যশীলদের জন্য এমন পুরস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন, যার কোনো নির্দিষ্ট পরিমাণ নেই। অর্থাৎ অন্য আমলের সওয়াব নির্ধারিত হলেও ধৈর্যের প্রতিদান হবে সীমাহীন।

 

ধৈর্য মানুষকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করে। এটি ঈমানকে দৃঢ় করে এবং বিপদের মধ্যেও আল্লাহর ওপর ভরসা রাখতে শেখায়। একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি জানেনপ্রতিটি কষ্টের পেছনে আল্লাহর কোনো না কোনো হিকমাহ রয়েছে। আল্লাহ তাআলা আরও বলেন

وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ ۝ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ

আর আপনি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা বিপদে পড়লে বলেনিশ্চয়ই আমরা আল্লাহরই এবং তার কাছেই ফিরে যাব।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৫-১৫৬)

বর্তমান সমাজে হতাশা, মানসিক চাপ প্রতিযোগিতার ভিড়ে ধৈর্য হারিয়ে ফেলা খুব সহজ। কিন্তু একজন প্রকৃত মুমিন জানেন, জীবনের প্রতিটি পরীক্ষা আসলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ঈমান যাচাইয়ের মাধ্যম।

ধৈর্য শুধু বিপদে নয়, গুনাহ থেকে বাঁচতেও প্রয়োজন

অনেকেই মনে করেন ধৈর্য মানে শুধু দুঃখ-কষ্ট সহ্য করা। অথচ ইসলামি শিক্ষায় ধৈর্যের আরও বিস্তৃত অর্থ রয়েছে। নামাজে অটল থাকা, হারাম থেকে নিজেকে বিরত রাখা, রাগ নিয়ন্ত্রণ করা এবং অন্যায়ের প্রতিশোধ না নেওয়াও ধৈর্যের অন্তর্ভুক্ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন

وَمَنْ يَتَصَبَّرْ يُصَبِّرْهُ اللَّهُ، وَمَا أُعْطِيَ أَحَدٌ عَطَاءً خَيْرًا وَأَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ

যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণের চেষ্টা করে, আল্লাহ তাকে ধৈর্য দান করেন। আর কাউকে ধৈর্যের চেয়ে উত্তম ব্যাপক কোনো নেয়ামত দেওয়া হয়নি।’ (বুখারি ১৪৬৯)

ধৈর্যশীলদের জন্য আল্লাহর বিশেষ সান্নিধ্য

ধৈর্যশীল মানুষ কখনো একা নয়। কারণ আল্লাহ নিজেই তাদের সঙ্গে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন

إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ১৫৩)

একজন মানুষের জীবনে এর চেয়ে বড় সান্ত্বনা আর কী হতে পারেযে আল্লাহ নিজেই তার পাশে আছেন!

ধৈর্য কোনো দুর্বলতার নাম নয়; বরং এটি একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় শক্তি মর্যাদা। জীবনের কঠিন সময়, দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা কিংবা প্রলোভনের মুহূর্তে যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ধৈর্য ধারণ করে, তার জন্য রয়েছে সীমাহীন প্রতিদান। আজকের অস্থির প্রতিযোগিতাপূর্ণ পৃথিবীতে ধৈর্য শুধু একটি নৈতিক গুণ নয়, বরং শান্তি, সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম চাবিকাঠি। তাই আমাদের উচিত প্রতিটি পরিস্থিতিতে ধৈর্যকে আঁকড়ে ধরা এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুত সীমাহীন পুরস্কারের আশায় অবিচল থাকা।

 

Previous Post Next Post